স্ট্রেস বা মানসিক চাপ বিষয়টি আজকাল বহুল আলোচিত একটি বিষয় আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটাকে ভুল ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। স্ট্রেসকে সহজ কথায় ব্যাখ্যা করা একটু হলেও কঠিন কাজ। কারণ আজকাল আপনি এমন কোন মানুষ খুঁজে পাবেন না যে তার কোন মানসিক চাপ নেই তার মানে কি সবাই স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ভুগছেন? আসলে স্ট্রেস হলো সাধারণ ভাবে মানসিক চাপের ফলে আমাদের শরীরের তৈরি হওয়া একটি প্রতিক্রিয়া যেটা হতে পারে অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক। মানসিক চাপ বাড়লে আমাদের শরীর সেটাকে যুদ্ধাবস্থা ধরে নিয়ে এক গাদা হরমোন আর রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ ঘটায়, যার ফলে শরীরে হঠাৎ অনেক উত্তেজনার তৈরি হয়, যা আমাদের পরিস্থিতির মোকাবেলায় সাহায্য করে।  এসময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয় আর আমাদের ইন্দ্রিয় গুলো আরও সজাগ হয়ে উঠে।  

এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী গিলিয়ার্ড এর বিশ্লেষণ দেখা যেতে পারে।  আমরা আমাদের প্রতিদিনকার জীবণে যখন স্ট্রেস এর সম্মুক্ষীণ হই তখন আমাদের শরীর মন এমন ভাবে তৈরী হয় যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে তা সমাধান করতে পারে।  অর্থাৎ যখন আমরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়ি তখন আমাদের কর্মক্ষমতা এবং তার কার্যকারিতা পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়তে থাকে।  তাই, অফিস-এর হঠাৎ এসে যাওয়া বছর শেষের কাজ হোক বা পরীক্ষার আগের দিনের শেষ মুহূর্তের রিভিশন হোক, আমাদের শরীর ও মন, দুইই সেই কাজ সম্পূর্ণ করে নেয়। সেই দিক থেকে ভাবলে বরং স্ট্রেস আমাদের জন্য ইতিবাচক ভুমিকা রাখছে। 

তবে এই ইতিবাচক ভুমিকা থাকে একটা সীমারেখা অব্দি।   একটা বিশেষ সীমারেখার পরেই অসুখ ‘স্ট্রেস’ শুরু হয়, যেখানে মানসিক চাপ অনুযায়ী শারীরিক শক্তি তো খরচ হয় দ্বিগুণ কিন্তু দেখা যায় কার্যকারিতা না বেড়ে ক্রমশ কমতে থাকে।  অর্থাৎ আমাদের শরীর ও মনের একটা নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী  পরিবর্তিত অবস্থার সাথে মানিয়ে নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজের চাপ নিতে পারে। আর স্ট্রেস তখনই সর্বনাশা রূপ ধারণ করে যখন আমাদের শরীর ও মনের এই ভারসাম্য বিগড়ে যায়।  অর্থাৎ সেই ভারসাম্যটি বিগড়ে গেলে পরিণতি বা ফলাফল আন্দাজ করা বহু ক্ষেত্রেই সম্ভব নাও হতে পারে।  সেইক্ষেত্রে অতিরিক্ত মানসিক চাপ আপনার বেশ ক্ষতি করে ফেলে।

আমরা যদি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারি তাহলে তা ক্রনিক স্ট্রেসে পরিণত হবে।  আর তার প্রভাব আমাদের শারিরীক মানসিক সামাজিক জীবনে পড়বে।

স্ট্রেস-এর ফলে মানসিক অশান্তি, অল্পেতেই মেজাজ হারানো,খিটখিটে ভাবের উৎপত্তি, কাজে উৎসাহ না পাওয়া থেকে শুরু করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া,কাজের ক্ষেত্রে ভুল করা,হাল ছেড়ে দেওয়া ভাব এমনকি নিজেকে আঘাত করা বা আত্মহত্যার চিন্তাও আসতে পারে।

মন ও শরীরের মাঝখানের রেখাটি এমনিতেই খুব অস্পষ্ট, আর স্ট্রেস-এর প্রভাব মন ছাড়িয়ে শরীর অব্দি পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না।  ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা থেকে শুরু করে ঘুম একদম না হওয়া, সর্বদা অবসন্ন লাগা,মাথা ব্যাথা,চোয়াল ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, খিদে কমে যাওয়া, সহজে হজম না হওয়া, এমনকি অ্যাজমা,গ্রন্থিতে ব্যথা,ইত্যাদি রোগগুলির বেড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

সামাজিক ক্ষেত্রে স্ট্রেস-এর প্রভাব বোধহয় সবথেকে বেশি পড়ে। সম্পর্কে জটিলতা থেকে ক্রমাগত সম্পর্কের ভেঙ্গে যাওয়া, বন্ধুহীনতা,পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং সহজেই নেশার কবলে পড়ে যাওয়া ও ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া আজকের সমাজে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু নয়।

যেসব কারণে স্ট্রেস হয় সেই কারণ গুলো নিয়ন্ত্রণ সব সময় আমাদের হাতে থাকে না, কিন্তু আমরা ঠিক করতে পারি স্ট্রেসের সময় আমাদের আচরণগুলো কি হবে।  যেহেতু একটা নিদির্ষ্ট সীমা পর্যন্ত আমাদের শরীর মন স্ট্রেস নিতে পারে তাই কিছু কৌশল জানা থাকা দরকার যা কাজে লাগিয়ে আমরা স্ট্রেসকে ইতিবাচক ভাবে কাজে লাগাতে পারবো আর নেতিবাচক স্ট্রেসকে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারবো।

এখন আমারা জেনে নিবো এমন কয়েকটি বিষয় যা আমাদের জীবনে স্ট্রেসকে কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে, যার মাধ্যমে আমরা স্ট্রেস কে নিয়ন্ত্রণ করবো ,স্ট্রেস আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

  • ব্যায়াম ও যোগ ব্যায়ামঃ সক্রিয়ভাবে খেলাধুলা করা এবং ব্যায়াম যে শুধু শরীরের উপকার করে,তা নয়। আধুনিক বিজ্ঞান আজ বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে পরিশ্রমের ফলে শরীরের অন্তর্নিহিত বিশেষ রাসায়নিকগুলি ক্ষরিত হতে থাকে। এদের মধ্যে এন্ডরফিন (endorphin) রাসায়নিকটি বিশেষভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে কাজ করে যা আমাদের হাসি খুশি রাখতে ও স্ট্রেস-মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।  যোগ ব্যায়ামেও একই উপকারিতা পাওয়া যায় । গবেষণায় দেখা গেছে স্ট্রেস এর জন্য ইয়োগা করার ফলে বেশীর ভাগ মানুষের মানসিক আর শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
  • ঘুম: ঘুম একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের সকলেরই শরীর খারাপ হয়। উপযুক্ত এবং পরিমাণমতো ঘুম স্ট্রেস-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের প্রয়োজন যদিও বিভিন্ন মানুষের বিভিন্নরকম, তবে দিনে ৭-৮ ঘন্টা ঘুম আমাদের সকলেরই দরকার। ঘুমের অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মোবাইল দেখা বন্ধ করুন। 
  • নিজের পছন্দের বিষয়গুলি নিয়ে সময় কাটানো: হবি (hobby) বা শখ। অবসর বিনোদনের উপায়। যদিও আজকের দিনে এসে টিভি সিরিয়াল দেখা বা স্মার্টফোনে গেম খেলা বা সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের সময় চলে যায় নিজের শখের জন্য সময় থাকে না।‘হবি’ বা শখ শব্দটার অর্থ কিছুকাল আগেও একটু আলাদা ছিল। নাচ, গান বা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখা,বই পড়া, বাগান করা থেকে ডাকটিকিট বা সেইরকম কিছু জমানোর দিনগুলিতে যদি আবার ফিরে যাওয়া যায়, সেই আনন্দ কিন্তু স্ট্রেস কাটাতে নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করবে।
  • খাদ্যাভ্যাস : সঠিক (গুণগত ও পরিমাণগত, দুইই) প্রকার খাবার  স্ট্রেস-কে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখে।  খেয়াল রাখতে হবে আমাদের প্রতিদিনের খাবারে  প্রয়োজনীয় ভিটামিন,মিনারেলস, স্বাস্থকর চর্বি, ইলেক্ট্রোলাইট, এমিনো এসিড আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার গুলো যেন থাকে । এই উপাদান গুলো শুধু আমাদের শরীরকে ভাল রাখে তা নয় এগুলো আমাদের মস্তিষ্ককে স্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়তে শক্তি যোগায়।  অন্যদিকে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রক্রিয়াগাত খাদ্য, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার, এ্যালকোহল,ক্যাফেইন আর রিফাইন্ড তেল খাবার বাদ দিন।
  • পরিবার বন্ধুবান্ধব: খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তা হলো পাশে থাকা বন্ধু বা পরিবারের লোকজন আমাদের স্ট্রেস-কে আয়ত্বে রাখতে অনেকটাই সাহায্য করে। শুধুমাত্র শুনবার কেউ বা কয়েকজন সঠিক লোক ও সম্পর্কের উষ্ণতা অনেকাংশেই আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে>
  • মেডিটেশন আর ভক্তিমুলক প্রার্থনাঃ মেডিটেশন আর ভক্তি মুলক প্রার্থনা মানুষের অস্থিরতা,দুশ্চিন্তা দূর করে মনে শান্তি নিয়ে আসে এটা কিন্তু পরিক্ষিত। আপনি দিনেরর যে কোন সময় নিজে নিজেই বাসায় বসে  ১০/১৫ মিনিটের জন্য এই মেডিটেশন করতে পারেন স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাবার জন্য। বহু যুগ আগে থেকেই মানুষ মন ও শরীরের সুস্থতার জন্য এই মেডিটেশ আর প্রার্থনার সাহায্য নিয়ে আসছে আর আজ বিজ্ঞানও এ বিষয়ে একমত। 
  • আকুপাংচারঃ গবেষনায় দেখা গেছে আকুপাংচার স্ট্রেস বা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে খুব সাহায্য করে বিশেষ করে যাদের হৃদরোগ আছে তাদের স্নায়বিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে যারফলে রক্তচাপ, রক্ত চলাচল,হরমোন সহ অনান্য বিষয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তথ্যসূত্রঃhttps://draxe.com/health/mental-health/stress-relievers/

https://articles.mercola.com/sites/articles/archive/2013/11/07/8-stress-management-tips.aspx
https://bigyan.org.in/2018/04/06/stress-what-why-how/#tnote-02
https://my.clevelandclinic.org/health/articles/11874-stress
https://www.helpguide.org/articles/stress/stress-symptoms-signs-and-causes.htm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.