আমার প্রথম সন্তান জন্মানোর পর তাকে শুধু বুকের দুধই খাওয়াচ্ছিলাম। কিন্তু আমার শ্বাশুড়ি মায়ের খুব দুশ্চিন্তা ছিল এ নিয়ে যে বুকের দুধ থেকে সব ধরনের পুষ্টি পাচ্ছে কিনা। তার এধরনের প্রশ্নে আমি নিজে খুব বিব্রত হতাম।  জানি এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি অনেক মাকেই হতে হয়। তবে মায়েদের জানা থাকা ভাল যে মা যদি ব্যালেন্স ডায়েটে নাও থাকেন।  তারপরও বাজারে কেনা ফরমুলা দুধের চেয়ে শিশুর জন্য মায়ের দুধই বহু গুনে ভাল। বুকের দুধে আছে যথেষ্ট পরিমান প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন,কার্বোহাইড্রেট। সেই সাথে আছে লিউকোসাইট বা শ্বেত রক্তকনিকা মত জীবন্ত কোষ যা বাচ্চাদের ইনফেকশন প্রতিরোধে সাহায্য করে । ডাক্তারা বলে থাকেন বুকের দুধ শিশুর প্রথম ছয়মাস যে কোন শিশুরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সব মায়ের দুধেই কি একই পরিমান পুষ্টিক উপাদান থাকে?  গবেষণায় দেখা গেছে যে বুকের দুধে পুষ্টি গুনের ভিন্নতা থাকে। কারন মায়ের দুধের পুষ্টিকর উপাদানের কম বেশী হয় মা কি ধরনের খাবার খাচ্ছেন তার উপর।  গবেষনায় আরো দেখা গেছে যে মায়েরা খাবারে যদি ফ্যাট, ভিটামিন বি বা ডি   কম খান তবে বুকের দুধেও সেটার ঘাটতি দেখা যায়।

তাহলে মায়েরা যারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদের কোন ধরনের খাবার খাওয়া উচিৎ যা বুকের দুধের পুষ্টির ঘাটতি পুরণ করবে, আর তা কি সম্ভব? হা সেটা সম্ভব যার জন্য যে পদ্ধতি অনুসরন করতে হবে তা হচ্ছেঃ

পদ্ধতি ১ঃ  যেসব খাবার খাবেন তার মধ্যে সামঞ্জস্যতাঃ  

ক) স্বাভাবিকের থেকে এসময় একটু বেশী খাবার খেতে হবে মাকে। প্রতিদিন যে পরিমান ক্যালরির খাবার খান তার থেকে  ৪০০ থেকে ৫০০ ক্যালরী বেশী খাবার খেতে হবে। যা মায়ের কর্মশক্তি যেমন বাড়াবে সেই সাথে বুকের দুধের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু এই অতিরিক্ত ক্যালরী যোগ করতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হবে খাবার গুলো যেন সুষম খাদ্য হয়। শুধু কার্বোহাইড্রেট বা শুধু ফ্যাট না হয়। যেমন তা হতে পারে লাল চাল বা লাল আটা , কিছু চিনাবাদাম, একটা কলা বা পেয়ারা বা দই এই ধরনের খাবার। 

খ) বুকের দুধে পুষ্টির উপাদান আরো বাড়াতে চাইলে মায়েদের প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে হবে। তাই খাবারে রাখতে হবে চর্বি ছাড়া মুরগীর মাংস, সেই সাথে দুধ,ডিম, বীচি জাতীয় খাবার, ডাল,সামুদ্রিক মাছ যেগুলোতে মারকারীর পরিমান কম।  

গ) এসময় মায়েদের শাক, সবজী, ফল আর ভাত,রুটির মত পুরো আশ জাতীয় শস্যের মত খাবারের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য রেখে খেতে। যেমন আপনি যদি প্রতিদিন ২৪০০ ক্যালরীর মত খাদ্য খান তাহলে আপনার খাবারে প্রতিদিন তিন কাপের মত সবুজ শাক সবজী, হলুদ সব্জী গাজর মিষ্টি কুমড়া, শ্বেতসার বহুল লাউ বা আলু রাখবেন।  সেই সাথে দুই কাপ পরিমান ফল আর ৮ আউন্সের মত লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি খাবেন।

ঘ) খাবারের মধ্যে বৈচিত্র থাকতে হবে।  একই ধরনের খাবার না খেয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাবেন তাহলে তা মায়ের দুধের স্বাদেও ভিন্নতা আসবে।  শিশুও এই স্বাদ গুলোর সাথে পরিচিত হবে ।  ছয় মাস বয়েসে যখন সে শক্ত খাবার খাবে তখন এই স্বাদ তাকে সাহায্য করবে নতুন খাবার সহজেই গ্রহন করতে।

ঙ) অনেক সময় দেখা যায় মা কোন কোন খাবার খেলে যেমন দুধ জাতীয় বা ঝাল খাবার খেলে শিশুর হয়তো অ্যালার্জিক রিয়েকশন হচ্ছে।  তবে মনে রাখতে হবে যে মায়ের দুধ পান করার কারনে এই সমস্যে হচ্ছে না , সমস্যা হচ্ছে মা যে খাবার খাচ্ছেন তার কোন বিশেষ একটা থেকে।  তাই এ ধরনের সমস্যা হলে খেয়াল রাখতে হবে কোন বিশেষ খাবার খেলে শিশুর সমস্যা হয় সেই খাবারটা মাকে বাদ দিতে হবে।

চ) স্বাস্থ্য সম্মত পুষ্টিকর খাবার খেলেই মায়ের বুকের দুধে যথেষ্ট পরিমান ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায় যা তার শিশুর জন্য দরকার।  তারপরও যদি আপনার দুশ্চিন্তা হয় যে সেটা শিশুর জন্য পর্যাপ্ত নয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন আর মিনারেল সাপ্লিম্যন্ট খেতে পারেন।  

ছ) কোন মা যদি নিরামিষাশী হন তবে তার খাবার তালিকা একটু খেয়াল করে তৈরি করতে হবে। নিরামিষাশী মায়ের খাবারে প্রচুর পরিমান আয়রন, প্রোটিন, আর ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে।  যেমন আশ যুক্ত চাল গম, মটর, গাড় সবুজ শাক সবজী খেতে হবে যা শরীরে আয়রন কে শোষন করতে সাহায্য করবে।  খাদ্যে তালিকায় থাকতে হবে ডিম ,দুধ ,দুধ জাতীয় খাবার বা সেই সব উদ্ভিত জাতীয় খাবার যেগুলোতে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন যেমন সোয়া বিন,সোয়া মিল্ক, টফু।  সেই সাথে ডাক্তারের পরামর্শ অনু্যায়ী ভিটামিন বি১২ যা শিশুর মস্তিষ্কের উন্নতির জন্য দরকার আর ভিটামিন ডি যা শিশুর শরীরে ক্যালসিয়াম আর ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে সেগুলোর সাপ্লিম্যান্ট খাওয়াও জরুরী।  

পদ্ধতি ২ ঃ পানীয় পানে সামঞ্জস্য রাখা

১) যদিও পানি বা অন্য কোন পানীয় পান করলে তা বুকের দুধের পরিমান কমায় বা বাড়ায় না কিন্তু তৃষ্ণা পেলে বা যতবার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন ততবারই এক গ্লাস পানি পান করা উচিত।  তবে এক্ষত্রে খেয়াল রাখাবেন শুধু পানি পান করাই ভাল। কারন মিষ্টি জাতীয় বা কোমল পানীয় খেলে অযথা মায়ের ওজন বেড়ে যাবে।

২) যে সব পানীয়তে ক্যাফেন আছে যেমন চা, কফি তা পান করার পরিমান কমিয়ে দিতে হবে।  কারন মা যদি অতিরিক্ত চা কফি পান করেন তাহলে শিশুকে চঞ্চল করে তুলতে পারে বা তার ঘুমেও ব্যঘাত ঘটাতে পারে।

৩) শিশু যদি বুকের দুধ খায় আর মা যদি মদ্যপান করেন অল্প পরিমানে তা শিশুর উপর খুব বেশী প্রভাব ফেলবে না।  তবে পরিমান বেশী হলে অবশ্যই মাকে বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।  যতক্ষন না পর্যন্ত স্বাভাবিক উপায়ে মায়ের শরীর থেকে তা বেড়িয়ে না যাচ্ছে। 

তবে যে মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তারা এই আলোচনায় চিন্তিত হয়ে পরবেন না যে আপনাকে এর জন্য বিশেষ ডায়েট পালন করতে হবে।  আপনারা শুধু খেয়াল রাখবেন যে আপনার খাদ্য তালিকায় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিযুক্ত খাবার আছে কিনা যা  শিশুর জন্য যেমন জরুরী তেমনি  আপনার নিজের জন্যও জরুরী । এতটুকু খেয়াল রাখলেই যথেষ্ট।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.