সবাই যেন এক চিলের পেছনে ছুটছে। ওই চিলের কাছে আছে ওজন কমানোর মন্ত্র। পৃথিবীর সব কাজ করে ফেলছি, কিন্তু ওই চিলকে কিছুতে ধরতে পারছিনা, তাই ওজনও কিছুতেই কমাতে পারছিনা। অথচ ওজনকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখার জন্য সচেতনতা আর একটু যত্ন – এই দুই হলেই যথেষ্ট। 

১। ওজন সাতদিনে বাড়েনি। ধীরে ধীরে সাত মাস বা সাত বছর ধরে আপনার ওজন একটু একটু করে বেড়েছে। প্রতি ঈদে আগের বারের চেয়ে এক সাইজ বড় কাপড় কিনেছেন বা বানিয়েছেন। দর্জিকে দিয়ে কিছু কাপড় অলটার করেছেন, কিছু কাপড় অন্যকে দিয়ে দিয়েছেন। এভাবে করতে করতে ওজন কখন সীমানার চেয়ে ১৫ বা ২৫ কেজি বেড়ে গিয়েছে বুঝতেই পারেননি। কিন্তু হঠাৎ একদিন উপলব্ধি আসল। আর আপনি সিধান্ত নিলেন, আর না এবার ওজন কমাতে হবে। খুজতে শুরু করলেন কিভাবে ৭ দিনে সব ওজন কমিয়ে ফেলবেন। পেয়েও গেলেন কোন এক রেসিপি। কিন্তু যখন ৭ দিন বা ১৭ দিনেও তেমন বেশি ওজন কমলনা তখন মন খারাপ করে আবার আগের রুটিনে ফেরত গেলেন। কি চেনা লাগছে গল্পটা? মহাশয়/শয়া ওজন যদি ৭ বছরে বারিয়ে থাকেন, কমানোর জন্য অন্তত ৭ মাস সময় দিন। ধৈর্য ধরুন আর লেগে থাকুন। সুফল আসবেই। 

২। শুধু ফল খেয়ে ওজন কমাবো বা শুধু ডিম খেয়ে ওজন কমাব, এই ধরণের পদ্ধতি কক্ষনই ভাল ফল নিয়ে আসেনা। আপনি হয়ত ওজন কিছুটা কমিয়ে ফেললেনও, কিন্তু অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন বা চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়তে পারে। কারন শরীরের জন্য শর্করা, আমিষ, তেল, মিনারেল, ভিটামিন ও পানি এই ছয় এর প্রত্যেকটিরই দরকার। যেমন যারা নিরামিষাশী, তাদের বাইরে থেকে ভিটামিন বি এর সাপ্লিমেন্ট খেতে হয়। তাই আপনি সুষম খাবার খেয়ে ওজন কমানোর পদ্ধতি জানার চেষ্টা করুন। 

৩। খাওয়ার সময় যা ইচ্ছা তাই খাব, শুধু ব্যায়াম করে বাড়তি ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলব, এ ধারনা নিয়ে যারা আছেন তাদের জন্য ছোট্ট একটি হিসেব দেই। মনে করেন, আপনার ওজন ৫৫ কেজি। আপনি একটা গ্রুর মাংসের বার্গার খেলেন যা থেকে পেলেন প্রায় ২৫০ ক্যালরি। এখন এই ২৫০ ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলার জন্য আপনাকে ওইদিন ৩.৫ কিলো বেগে প্রায় এক ঘণ্টা হাটতে হবে অথবা ইয়োগা করতে হবে পৌনে দুই ঘণ্টা। এভাবে ইচ্ছেমত খাওয়া যাবতীয় জাঙ্ক ফুডের জন্য হিসেব করুন তো! কত ঘণ্টা হাটবেন আর কত ঘণ্টা ইয়োগা করে কাটাতে হবে আপনাকে। জীবনের বাস্তবতায় সেটা কতটুকু সম্ভব তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। 

৪। সাধারন একটা হিসেব বুঝলেই ওজন নিয়ে খুব বেশী দুশ্চিন্তা করতে হয়না। যেকোন জিনিসের চাহিদা আর যোগান এর হিসেব বুঝেন ? যখন চাহিদার চেয়ে  যোগান বেশী থাকে, তখন বাড়তি হয়। যখন চাহিদার চেয়ে  যোগান কম থাকে, তখন ঘাটতি হয়। চাহিদা যোগান সমান হলে লাভ বা ক্ষতি কিছুই হয় না। এখন আপনার শরীরে অর্থনীতির এই তত্ত্ব প্রয়োগ করুন। আপনার বয়স, উচ্চতা, লিঙ্গ, কাজের ধরন সবকিছুর উপর নির্ভর করে আপনার কত ক্যালরি দরকার প্রতিদিন। আপনি যদি কোন কাজ নাও করেন, শুধু শুয়ে থাকলেও শরীরকে সঞ্চালন করার জন্য ও খাবার থেকে শক্তি সংগ্রহের জন্য মস্তিষ্ক ও পাচনপ্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট ক্যালরি প্রয়োজন হয়।  ধরলাম আপনার শরীরের ক্যালরির প্রয়োজন প্রতিদিন ১৮০০ ক্যালরি। এখন আপনি যদি ওজন কমাতে চান তাহলে ১৮০০ এর কম ক্যালরি গ্রহন করলে ধীরে ধীরে ওজন কমবে, যদি বাড়াতে চান তাহলে ক্যালরি বাড়াতে হবে। আর একই রাখতে চাইলে সমান সমান (একদম সমান না হলেও অসুবিধা নেই, ২ থেকে ৫% এদিক ওদিক হতেই পারে) ক্যালরি নিতে হবে। 

৫। ওজন কমানোর অনেক ডায়েট প্ল্যানই বিদেশি। তাই ওতে থাকা খাবার আমাদের এখানে সহজল্ভ্য নয়। কিন্তু আমরা নিজেদের দেশে কি আছে তা বাছ বিচার না করেই অনেক সময় বহুগুন বেশি দাম দিয়ে ওইসব খাবার কিনে থাকি বা না কিনতে পেরে নিজেকে অসফল ভেবে বসি। যেমন কেল সব্জি হিসেবে ভাল, তাই বলে আমাদের পুই শাক, লাল শাক, পালং শাকের পুষ্টিগুন কিন্তু কম নয়। এভাকাডোতে হয়ত অনেক ভাল ফ্যাট আছে, কিন্তু একটা  এভাকাডোর দাম দিয়ে আপনি অন্তত এক ডজন দেশী ডিম কিনতে পারবেন। ডিমও কিন্তু ভাল ফ্যাটের পাওয়ার হাউজ। তাই আমাদের খুজে নিতে হবে আমাদের দেশের উৎপাদিত কোন পন্য আমাদের জন্য ভাল। 

ওজন নিয়ন্ত্রনে শতকরা ৮০ ভাগ নির্ভর করে আপনি কি ধরণের খাবার খাচ্ছেন তার উপর । বাকি বিশ ভাগ নির্ভর করে আপনি কতটুকু শরীরকে চলমান রাখেন। তাই শুধু খাবার নিয়ন্ত্রন করে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলা অনেক সহজ। হ্যা দরকার মনকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা, সদিচ্ছা আর ধৈর্য। তাহলে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন আপনি। তাই চিলের পেছনে না দৌড়ে ওজন কমাতে দৌড়ান। শুভ কামনা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.