আপনার সঠিক বয়স কোনটি ?

আপা কিন্তু খুব ভালোভাবে বয়সটা ধরে রেখেছেন, ভাইয়া আপনার বয়সতো বাড়েনা গত দশ বছর একই রকম দেখছি । এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি, এই বয়স ধরে রাখা মানে সময় ধরে রাখা নয়, সময় তার নিজস্ব গতিতেই চলছে, মহাজাগতিক নিয়মের কখনো কোন ব্যতিক্রম হয়না ।  ঘটনা হল পঞ্চাশের একজন নারী দেহে-মনে নিজেকে পঁয়ত্রিশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে -“যে মনের দিক থেকে বৃদ্ধ নয়,তার জীবনে বার্ধক্য আসেনা”, আসলে সেই নারীর জীবনে এই প্রবাদটি সত্য হয়ে এসেছে এতটুকুই।

আপাতদৃষ্টিতে যদিও বয়স একটি সংখ্যা মাত্র কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এই সংখ্যার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম, যেমন নাগরিক হিসেবে ভোটার হওয়া থেকে শুরু করে  ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া, চাকুরী , চিকিৎসা  সহ অসংখ্য বিষয় এই সংখ্যার দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত ।  জন্ম থেকে হিসেব করে এই কালানুক্রমিক  (Chronological )  সময়কেই  আমরা  বয়স হিসেবে গণ্য করি। কিন্তু আজকাল অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস মানুষের আসল বয়স এই সংখ্যা থেকে পৃথক হতে পারে।    তাদের ভাবনা মানসিক ভাবে আপনি যা বোধ করছেন বা যা অনুভব করছেন অথবা নিজেকে যে বয়সের বলে ভাবছেন তাই আপনার মনের বয়স। এখন প্রশ্ন থেকেই যায় যে মনের বয়সই কি তাহলে আমাদের আসল বয়স? একটা উদাহরণ দেয়া যাক –

 আপনার মনের বয়স কত ? মনে করুন আপনার বয়স এখন ৪৫, কিন্তু প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে গিয়ে গলা ছেড়ে কবিতা আবৃতি করেন।  ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নামতে দেখলে নিজেকে আটকে রাখতে পারেন না, ছাদে চলে যান ভিজতে। অথবা  টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখতে দেখতে তিভ্র ইচ্ছে হয় ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়াতে, তার মানে কি এই  আপনার মনের বয়সও ৪৫ ? অবশ্যই নাহ।  এসব বিজ্ঞানীরা বলছেন এর মানে আপনার মনের বয়স ২৫!!মনের বয়সকে অনেকে বলেন মনস্তাত্ত্বিক বয়স আবার কেউ কেউ বলেন আপেক্ষিক বয়স ।  

আমেরিকার ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির প্রফেসর Brian Nosek -এর ভাষ্যমতে,“যে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা নিজেদেরকে অনেক তরুণ ভাবেন, তারা তাদের দৈনন্দিন কাজে বা জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন”।   মনের তারুণ্যকে ধরে রাখতে পারলে তার কাছে কোন প্রতিবন্ধকতাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।  ঠিক এমন কাজই করে দেখিয়েছেন জাপানি ভদ্রলোক Yuichiro Miura, জীবনের শেষ দিনগুলো বসে বসে পার করেননি।  ২০০৩ সালে ৭০ বছর বয়সে একবার হিমালয়  জয় করেছেন,  আবার ৮০ বছর বয়সে আরেক বার হিমালয় চূড়ায় নিজের পদচিহ্ন রেখে এসেছেন সেই  ২০১৩ সালের ২৩ শে মে ।  গৌরব অর্জন করেছেন সব চেয়ে বেশী বয়সে হিমালয় জয়ের।  নাম লিখিয়েছেন গিনিস বুক অফ রেকর্ডে ।    

 দঃ কোরিয়ার আরেক গবেষণা পত্রে বলা হচ্ছে, নিজেকে যত বুড়ো ভাববেন আপনার মস্তিষ্ক ততো দ্রুত ক্ষয়ে যাবে, আর যতো তরুণ ভাববেন, মস্তিস্কও ততো তরতজা থাকবে অর্থাৎ আপনার মনের বয়স ঠিক করছে মস্তিস্ক, শরীর নয়।   গবেষকরা এমনও ধারণা করেন যে চিকিৎসকদের উচিত তাদের রোগীদেরকে নিজেদের আপেক্ষিক বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা, যাতে করে পরবর্তীতে কোন রোগীগুলো বেশী সাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন তা নির্ণয় করা যায় ও প্রথম থেকেই সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়।

কিভাবে পরিমাপ করবেন আপনার মনস্তাত্ত্বিক বয়সঃ-

অনলাইনে  অনেক ধরনের বয়স পরিমাপক পদ্ধতি বা ক্যালকুলেশন সাইট রয়েছে যারা আপনার জীবনযাত্রা,খাদ্যাভ্যাস এবং বিএমআই  “BMI” (body mass index) সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে আপনার স্বাস্থ্য এবং ফিটনেস মূল্যায়ন করে মনস্তাত্ত্বিক বয়স নির্ধারণের করে দেবে।   কিন্তু ডালাসের কুপার ক্লিনিকের কুপার অ্যারোবিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং একজন প্রতিরোধক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ কেনেথ কুপারের মতে, এই জাতীয় সূত্রগুলির সিদ্ধান্ত  মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং যথাযথও নয়। বিপরীতে তিনি বলছেন এটি মূলত  হৃৎপিণ্ডেড়  সাথে সম্পর্কযুক্ত।  মনস্তাত্ত্বিক বয়স পরিমাপের জন্য করোনারি ধমনীর ক্যালসিফিকেশন [ ( Coronary artery calcification )  মানব দেহের করোনারি আর্টারি বা ধমনীতে ক্যালসিয়াম জমা হয়ে রক্তনালীগুলিকে সংকীর্ণ করে , এটাকে বলা হয় করোনারি আর্টারি ক্যালসিফিকেশন ] হ’ল সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়, “তিনি এটাকে বলছেন  “arterial age.” যাকে বাংলায় বলা যায় ধমনীর বয়স । তিনি ব্যাখ্যায় বলেছেন – যে বয়সের করোনারি ক্যালসিফিকেশন বৃদ্ধি পায়, সেই বয়সে আপনার ধমনীর ক্যালসিফিকেশন প্রত্যাশিত ক্যালসিফিকেশন স্তরের উপরে বা  নিচে থাকার ফলে আপনার হৃৎপিণ্ড আপনার কালানুক্রমিক বয়সের চেয়ে বেশি বয়স্ক বা কম বয়স্ক  হবে। উদাহরণস্বরূপ: যদি ৬৫ বছর বয়সী কোন  ব্যক্তির প্রত্যাশিত করোনারি  ক্যালসিফিকেশন ৫৫ বছর বয়স অনুপাতে থাকে তবে তার  মনস্তাত্ত্বিক বয়স  কালানুক্রমিক বয়সের তুলনায় ১০ বছর কম বলে ধরে নেয়া যুক্তিসঙ্গত।               

২০১৮ সালে “জার্নাল সার্কুলেশনে”প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের উপর পরিচালিত এক জরিপের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে স্বাস্থ্য রক্ষা ও দীর্ঘায়ুর মূল কার্যকারণ পাঁচটি ।    

   ১.স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য গ্রহন,  

    ২.নিয়মিত ব্যায়াম করা ,

    ৩.ধূমপান না করা্‌ ,

    ৪.মদ্য পান পরিহার করা ,

    ৫.যথাযথ ওজন বজায় রাখা ,   

ডাঃ কুপার আরেকটি গবেষণার দিকে ইঙ্গিত করেছেন যা থেকে দীর্ঘায়ু সম্পর্কে  অনুমান করা যায়, তা হল আপনি কতটা দ্রুত হাটতে পারেন। তথ্য অনুসারে, আপনি যদি ৮০ বছর বয়সী হন এবং ১১ মিনিটের মধ্যে এক কি.মি. হাঁটতে পারেন তবে আপনার আরও ১০ বছর বেঁচে থাকার ৮৪% সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও অনেক কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ।  ডাঃ কুপার আরও বলেন আমাদের কেবল রোগ নিরাময়ের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত নয় বরং রোগ প্রতিরোধে উপায় নির্ধারণে মনোনিবেশ করা দরকার।

আপনার বয়স যাই হোক না কেন, বার্ধক্যের সীমাবদ্ধতাগুলো মনের ভেতর থেকে আসছে কিনা, মানসিকভাবে আপনি তরুণ না বৃদ্ধ সেই প্রশ্ন মনকে করা এখন সময়ের দাবি।। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.