একবিংশ শতাব্দীর এই প্রতিযোগীতা মূলক বিশ্বে প্রতিনিয়ত আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধুই ছুটে চলেছি। আমরা দিনে ৮/১০ ঘন্টা একই ধরনের কাজ করছি আবার বাড়ি ফিরেই কম্পিউটারে বসছি, না হয় মোবাইলে খেলছি বা সোসাল মিডিয়াতে সময় কাটাচ্ছি বা টিভি দেখছি। আমরা প্রতিনিয়তই এমন কিছু করছি যা আমাদের মস্তিস্ককে উত্তেজিত করছে। তারপর খুব অল্প সময় ঘুমিয়ে উঠে পরদিন একই কাজের পুনারাবৃত্তি করছি। হয়তো শরীরকে ভাল রাখার জন্য আমারা ভাল খাচ্ছি, ব্যায়াম করছি। কিন্তু আমরা জানিনা এই বিরামহীন ছুটে চলা আমাদের শরীর আর মনের উপর কি প্রভাব ফেলছে। এই বিশ্রাম বিহীন অফুরন্ত ছুটে চলাই আমাদের জীবনে বাড়তি হিসাবে যোগ করছে মানসিক উদ্বেগ বা চাপ।
আমরা অনেকেই জানিনা মস্তিষ্ক কিন্তু এমনভাবে ডিজাইন করা যে তা ৯০ থেকে ১২০ মিনিটের এর বেশী কোন একটা বিষয়ে একটানা মনোযোগ দিতে পারে না। তাই যে কোন কাজেই একটা নির্দিষ্ট সময় পর মস্তিষ্কের বিশ্রামের দরকার হয়। বেশীরভাগ সময় দেখা যায় আমরা আমাদের শরীরকে ঠিকই বিশ্রাম দিচ্ছি কিন্তু আমাদের মাথায় তখনো হাজারো চিন্তা চলতে থাকে । এতে শরীরের বিশ্রাম হলেও মনের আর বিশ্রাম হয় না।
কিন্তু কিভাবে এই বিশ্রাম নেয়া যায় তাও আমাদের সঠিকভাবে জানা নেই। হয়ত কাজের প্রেশারে ক্লান্ত লাগলে আপনি ছুটি নিয়ে ঘুরতে চলে যাচ্ছেন বা বাসায় থাকছেন। কিন্তু এই ছুটি নিয়ে বাসায় থেকেও হয় আত্মীয় স্বজনের বাসায় দাওয়াতে যাচ্ছেন , সামাজিকতা পালন করছেন, বাসার জমে থাকা কাজ সারছেন বা বন্ধু বান্ধব মিলে পার্টি করছেন। কিংবা দূরে কোথাও বেড়াতে গেলেও বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ে বেড়াচ্ছেন, সারাক্ষন ফোনে বা সোসাল মিডিয়াতে ব্যস্ত থাকছেন। এসব কিছুই আসলে প্রকৃত অর্থে আপনার মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিবে না। প্রতিদিন যেমন শরীরের বিশ্রাম প্রয়োজন হয়, একই ভাবে মনেরও নিয়ম-মাফিক বিশ্রাম প্রয়োজন হয়।
কেন মনের বিশ্রাম দরকারঃ
আপনাদের মনে হতে পারে, মনের আবার বিশ্রামের কি আছে! কি দরকার আলাদা করে এই বিশ্রামের। তারচেয়ে সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে আপনারা অনেক কাজ করতে পারবেন যা আপনাদের সব দিক দিয়ে এগিয়ে রাখবে। কিন্তু আপনি ভুল ভাবছেন! সব সময় কাজের মধ্যে থাকলেই যে আপনার কাজ খুব ভাল হবে তা নয় বরং তার ফলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষাদের মত বিষয়গুলো আপনাকে পেয়ে বসতে পারে। তাই আমাদের মস্তিষ্কর সারাদিন একটু একটু করে বিশ্রাম দরকার, তা শুধু নয় কিছু দিনের জন্য । কাজ, স্কুল আর জীবনের প্রতিদিনকার ঝক্কি ঝামেলা থেকে দূরে থাকা দরকার।
কারণ হচ্ছেঃ
- আমরা যদি আমাদের মনকে বিশ্রাম না দেই তাহলে আমরা কোন কাজই সৃজনশীলতা আর দক্ষতার সাথে করতে পারব না। আমাদের মস্তিষ্ক তখনই ভালভাবে কাজ করে যখন আমরা একে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দেই। বিশ্রামের পরই দেখা যায় যে কোন কাজে খুব সুন্দর, সৃজনশীল আর নতুন নতুন ভাবনা মাথায় আসে।
- গবেষণাতে জানা যায় আমাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশ যা যুক্তি,পরিকল্পনা,সিদ্ধান্ত গ্রহন, বিচার বিবেচনার জন্য কাজ করে, তা তখনই খুব ভালভাবে কাজ করে যখন আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্রামে থাকে। বিশ্রামে থাকলেই মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন ভাবনা আসে এবং পূর্বের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সাথে নতুন গুলোকে মিলিয়ে আরেকটা নতুন চিন্তা ভাবনা , দিক নির্দেশনা আর কার্যকরী সমাধান দেয়।
- আমদের মনকে বিশ্রাম দেয়া খুবই জরুরী কারণ এই বিশ্রাম আমাদের শরীরে করটিসল হরমোন যা আমাদের মানসিক চাপ বাড়ায় সেই হরমোনকে কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আমরা যদি সব সময় বিভিন্ন চাপের মধ্যে থাকি তখন আমদের শরীর থেকে করটিসল হরমোন বের হয়। যার আরেক নাম স্ট্রেস হরমোন। এই হরমোন শরীরে বেশী হয়ে গেলে মস্তিষ্কের হিপোকেমপাস যা আমাদের জ্ঞান অর্জন আর স্মৃতি শক্তির জন্য কাজ করে তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাছাড়াও শরীরে করটিসল হরমোন বৃদ্ধি পেলে অনেক ধরণের রোগ হয়। যা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী রোগে পরিণত হয় যেমনঃ মাথা ব্যথা,হজম ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি।
- মনকে ছুটি দিলে আমাদের মধ্যে থেকে নেতিবাচক ভাবনাগুলো দূরে সরে যায় তখন মস্তিষ্ক থেকে আমাদের শরীরে এনড্রোফিন হরমোন বের হয়। যাকে বলা হয় আনন্দের হরমোন। যার ফলে আমরা আমাদের আশে পাশের যা কিছু ঘটবে তা থকেই আনন্দ পাবো আর তাতে নিজেকে আরো বেশী ভারসাম্য পূর্ণ ও শান্তি পূর্ণ মনে হবে।
- মনকে সঠিকভাবে বিশ্রাম দিতে পারলে আমাদের ভিতর নতুন করে কর্মশক্তি আর আশাবাদ তৈরি হয় যা আমাদের কাজের উদ্যোমকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
কিছু সহজ উপায় মনকে বিশ্রাম দেওয়ারঃ
১) বাইরে ঘুরে আসুন। বাইরে গেলে আমাদের মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে। ঘরের বাইরে গেলে আমদের শরীরে ভিটামিন ডি ও সেরোটিনের উৎপাদন বৃদ্ধি হয় আর সেই সাথে ভাল অনুভব করা যায়। বাইরে যেতে না পারলে অন্তত জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখুন। কাজের জায়গায় বা বাসার এক কোনে গাছ রাখুন, গাছের দিকে তাকিয়ে মনকে বিশ্রাম দিন।
২) ব্যয়াম করুন। যদি ব্যায়াম না করতে পারেন হাটতে চলে যান বা সিড়িতে উঠা নামা করুন।পার্ক থাকলে সেখানে চলে যান ঘুরতে, সোজা কথায় এক জায়গায় বসে থাকবেন না। যদি কাজে থাকেন তাহলে পাঁচ মিনিট বিরতি নিয়ে হাত পা টান টান করুন, একটু হাটুন, জায়গায় দাঁড়িয়ে একটু লাফান বা পুশ আপ করুন।
৩) মেডিটেশন করতে পারেন। বিজ্ঞানের মতে মেডিটেশনে আমাদের মস্তিষ্কের বাম দিকের সম্মুখভাগ যা আমাদের ইতিবাচক আবেগের সাথে জড়িত তাকে উদ্দীপিত করে। যারফলে অন্য অংশ যা নেতিবাচক আবেগের আথে জড়িত তাকে সে কমিয়ে আনতে পারে।
৪) প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকুন। আমাদের মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ইন্টারনেট সব ধরণের প্রযুক্তি থেকে প্রতিদিনই কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকা উচিৎ। আপানার ফোনটাকে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ বা সাইলেণ্ট মোডে রাখুন যাতে ধরতে না হয়। ল্যাপটপ দূরে সরিয়ে রাখুন টিভি বন্ধ রাখুন। এভাবে প্রতিদিনই কিছু সময় বা একটা বিকেল বা রাত এই সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন। দেখবেন এই নিস্তব্ধতা আপনার মনকে বিশ্রাম দিবে।
৫) কিছুই না করে থাকুন না দিনের একটা সময়। কিছু না মানে কিছুই না , আপনার মনটা কে ছেড়ে দিন সে ইচ্ছে মত উদ্দেশ্যহীন ভাবে মনোজগতে বিচরণ করুক কিছু সময়ের জন্য। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে সৃজনশীলতার বিকাশ তখনই হয় যখন মন কোন একটা বিষয়েই না থেকে মনোজগতে বিচরণ করে।
তথ্যসূত্রঃ












