২০১১ সালের এক ঝুম-বৃষ্টির বিকেলে আমাদের প্রথম শিশুর জন্ম হল – ‘কন্যা সন্তান’। অন্যদিনের বৃষ্টি বোধহয় এতখানি মূর্ছনা-মধুর হয়না, সেদিন যেমনটা হয়েছিল। অফিসিয়ালি আমি সেদিনই জানলাম ‘মেয়ে’ হবার কথা। যদিও আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে অনেক আগে থেকেই জানা যায়; আমি জানতে চাইনি। মনে হয়েছিল – থাক না এই সারপ্রাইজটা শেষতক গচ্ছিত, ক্ষতি কী?

অদ্ভুত ঘোরলাগা প্রথম একটি-দুটি দিন। আত্নীয়-বন্ধু- শুভাকাঙ্ক্ষীর আনাগোনা। এরমাঝে এক বন্ধুপ্রতিম অতিথি আমাকে বলে বসলেন, “এখন তো আপনার পিস্তল কিনতে হবে।” অকস্মাৎ কথোপকথনে সে কথার অর্থ আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি বিধায় উনি ব্যাখ্যা দিলেন, “শুনেন, এখন তো আপনি মেয়ের বাপ। মেয়ের বাপ হইলে একটা পিস্তল থাকা লাগে।” হাস্যরসের মেজাজেই কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু এই কৌতুকটা ছেলে শিশুর বেলায় তো প্রাসঙ্গিক নয়। কিংবা সভ্যতায় অগ্রগামী দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে হয়ত ছেলে-মেয়ে কোন শিশুর বেলায়ই প্রযোজ্য নয়। তাই আমাদের সামাজিক-বাস্তবতায় মেয়ে শিশুর বেলায় এই কৌতুকের সম্ভাব্য-ক্ষীণতম প্রাসংগিকতাও সমাজ-সংস্কারের প্রয়োজনকেই সাক্ষ্য দেয়।

আমাদের মেয়ে হবার কিছুদিন পরে এক আত্নীয় আমার বউকে বলেছিলেন, “তুমি কিন্তু একেবারেই মন খারাপ করবা না।” উনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর এগোয়নি। তাই আমি ভেবেছিলাম উনি এখনও ‘পুত্র সন্তান’-এর চিরায়ত মোহ থেকে বেরোতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক মানুষের সাথে কথা বলে বুঝেছি – এই অলীক ধারণার সাথে তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। পারিবারিকভাবে লালিত মূল্যবোধই মানুষকে আজীবন প্রভাবিত করে; কম ক্ষেত্রেই মানুষ সেই প্রভাব অস্বীকার করতে পারে।

আমি অবশ্য যারপরনাই খুশি ছিলাম। বাচ্চার ঘুম, খাওয়া, গোসল, কাপড় ধোয়া, বোতল পরিস্কার  ইত্যাদি সব কাজেই আমি সর্বতোভাবে অংশগ্রহণ করেছি। ঠিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই নয়, আমার এগুলো করতে ভালোও লাগত।  ‘মেয়ে’ বাচ্চা বলেই কিনা জানিনা, আমার সাথে বাচ্চার সখ্যতা অনেক বেশি ছিল। বাইরে কোথাও ঘুরতে গেলে, মার্কেটে, রেস্তোরাঁয়, পারিবারিক দাওয়াত-অনুষ্ঠানে মেয়ের ডায়াপার চেঞ্জ, বাথরুমে যাওয়া, খাবার খাওয়ানো – সবকাজেই আমি হাত লাগিয়েছি। আমাদের দ্বিতীয় মেয়ের বয়স দু’বছর। ওর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছেনা। বাবা হয়ে এগুলো করছি দেখে অনেকেই আমাকে প্রশংসা করেছেন। কারণ এসব কাজ বেশিরভাগ সময় বাচ্চার মায়েদের করতে দেখেই আমরা অভ্যস্ত। তবে এখন নিয়ম বদলাচ্ছে, ধীরে হলেও বদলাচ্ছে – সময়ের প্রয়োজনেই বদলাচ্ছে।

আমার দুই বাচ্চাকেই স্কিন-কালার নিয়ে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার বড় মেয়ের গায়ের রঙ, আমার বউয়ের থেকে ফর্সা(!)। তো এক আন্টি একবার আমার বউকে বলেই ফেললেন, “দেখসো মুনিয়া! ফর্সা জামাই বিয়ে করলে এটাই সুবিধা। বাচ্চা-কাচ্চা ফর্সা হয়”। আমার ছোট মেয়ের বয়স যখন মাস-দুয়েক হবে, এক আত্নীয় একবার বাসায় এসে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, “ওর গায়ের রঙ মনে হয় একটু চাপাই হবে”। এসব কথায় আমার অবশ্য রাগ হয়না, বরং আমার বউয়ের যে গাত্রদাহ হয় তা দেখে আমি অদ্ভুত আনন্দ পাই।

এই যুগের প্যারেন্টিং অনেকখানি বদলে গেছে। আমার ছোটবেলায় আমি প্রতিনিয়তই শুনেছি পাড়ার অমুক ছেলে-তমুক মেয়ে আমার থেকে কতখানি ভালো, কী কী জিনিস আমার তাদের কাছ থেকে শেখা উচিত। কোন কোন ক্ষেত্রে টোটকা হিসেবে ‘পা-ধোয়া পানি’ খাওয়ার কথাও শুনেছি। আমার বড় মেয়ে এখন ক্লাস টু’তে পড়ে। ওকে কখনও অন্য কারও মত হতে বলিনি। বানান ভুল, হাতের লেখা কিংবা যোগ-বিয়োগে ভুলের জন্যও বকা-ঝকা করিনি। নিজের মত করে ও শিখে যাচ্ছে, ভুল করতে করতেই একদিন ভুল-না করাটাও শিখে যাবে। আমরা শুধু এটুকু বোঝাই – মিথ্যা বলা যাবেনা, চিটিং করা যাবেনা, কাউকে কটু কথা বলা যাবেনা।

“ফার্স্ট-সেকেন্ড হয় যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে” – এই ধরনের মন্ত্র আমি আমার মেয়েদের শেখাবোনা বলে ঠিক করেছি। আমি হয়ত ভালো মানুষ হতে বলব, সভ্য নাগরিক হতে শেখাবো, জেন্ডার-ইকুয়ালিটির দীক্ষা দিব।  এটাও বলব যে ভালো রেজাল্টে কোন ক্ষতি নাই – তবে সেটা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, চাপের মুখে না।

যে বিষয়টি নিয়ে আমি সত্যিই শংকিত তা হল – ইন্টারনেট এবং অগণিত টিভি চ্যানেলের সহজলভ্যতা, অবাধ ব্যবহার। এখান থেকে অনেক ভালো জিনিস শিখছে – রান্না শিখছে, ছবি আঁকা দেখছে। আবার জীবনের ভুল সংজ্ঞাটাও শিখছে – ‘জীবন মানে জি-বাংলা’।লক-ডাউনের মাঝে অন-লাইন স্কুল করছে; আবার ঘন্টার পর ঘন্টা ইউটিউবে নিমগ্ন থাকছে। আমি সত্যিই জানিনা এটার অপটিমাম-ব্যালেন্স কোথায়? কিছুটা ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ছোট্টোবেলায় শেখা রচনায় ফেরত গেছি – বিজ্ঞান আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ; পনের পাতা লিখে ফেললেও এই রচনা শেষ হয়না।

ছোটবেলায় আমরা যখন টিভিতে নাটক-সিনেমা দেখতাম বাবা-মা’র সাথে, তখন কোন রোমান্টিক দৃশ্য দেখলে ইতস্তত বোধ করতাম। আমার মেয়ে নিঃসংকোচে আমার গায়ে হেলান দিয়ে টিভি দেখে। কিছু পরিবর্তন মেনে নিতে হবে, সেই সাথে কন্ট্রোল-মেকানিজমেও পরিবর্তন আনতে হবে।

আমরা এখন নারী-স্বাধীনতার কথা বলছি, নারী-পুরুষ সাম্যের কথা বলছি। তবে এ যাত্রার সবে শুরু। বৈষম্য আসে পারিবারিক শিক্ষা থেকে, তাই অভিভাবকদের মূল্যবোধে পরিবর্তন আনাটা সবার আগে জরুরী। আমাদের কন্যাদের সাম্যাবস্থা নিরাপদ করতে হলে আমাদের পুত্রদেরকেও সাম্যের শিক্ষা দিতে হবে। প্রথম যখন ‘কন্যাদায়গ্রস্ত’ শব্দটার সাথে পরিচিত হলাম, তখন শিখেছি আমরা যুগে যুগে আমাদের কন্যাদের প্রতি কতটা বৈষম্য দেখিয়েছি – এখনো শিখছি। এর প্রতিকার করবার জন্য আমরা দায়গ্রস্ত – আমি বাবা হিসেবে দায়গ্রস্ত আমার কন্যার প্রতি, আমরা সমাজ হিসেবে দায়গ্রস্ত আমাদের কন্যাদের প্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.