তিনটি অলীক বিশ্বাস যা আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে বাঁধা দেয়
আপনারা কি জানেন এই আধুনিক যুগেও বহু মানুষের জীবন পরিচালিত হয় কিছু অলীক বা কল্পিত বিশ্বাস দিয়ে । আমাদের নিজের অজান্তেই এই ধরনের অলীক বিশ্বাস মনের মধ্যে বাসা বাধে আর আমাদের জীবন সমন্ধে উপলব্ধি, চিন্তা চেতনা ভাবনা সব কিছুকেই প্রভাবিত করে । এই অলীক বিশ্বাসগুলোর মধ্যে সেইগুলোই বেশী বিপদ জনক যা আমাদের মধ্যে ভাললাগার অনুভূতি জাগিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করে সেইজন্য আমারা সহজে তা ছাড়তেও পারি না। একসময় এই গুলোই বদ্ধমুল বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয় আর আমাদের চিন্তা ভাবনাকে ভুল রাস্তায় নিয়ে যেতে থাকে। এই ধরনের বিশ্বাস গুলো অতি সাধারণ মনে হলেও আমাদের জীবনে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। জীবনকে নিজের মত করে সামনে এগিয়ে নিতে গেলে এগুলো আমদের পিছনে টেনে ধরে । আজ আলাপ করবো তিনটি অলীক বিশ্বাস নিয়ে যেগুলোর প্রভাব আমাদের উপর অনেক বেশী এবং জানবো এ বিশ্বাস গুলো আমাদের জীবনকে কিভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।
স্বপ্নের পুরুষ বা নারীঃ
আমার ধারনা বেশীরভাগ মানুষ মনের ভিতর একজন স্বপ্নের পুরুষ বা নারীর একটা ছবি নিয়ে বড় হয়। ছোট বেলা থেকে মনের মাঝে তৈরী হয় যে তার জন্য বিশেষ একজন মানুষ আছে। যে শুধু তার জন্য তৈরী সেই তাকে পরিপূর্ন করবে যাকে ছাড়া সে অসম্পুর্ণ। যেই মানুষের কাছেই সে সম্পুর্ণ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এই মানুষটার মধ্যে কোন খারাপ গুন নেই, আদ্যপান্ত ভাল গুনের সমাহারে তৈরি হয় এই কল্পনার মানুষ। কিন্তু এই “ভাল গুনের” সংজ্ঞা টা কি?
ক। আপনার কাছে যা যা ভাল লাগে, তাই আপনি এই স্বপ্নের মানুষের মধ্যে দেখতে চান।
খ। আপনার কল্পনায় এই মানুষটি আপনার সব মতামতের সাথে একমত হয়
এই ধরনের অলীক বিশ্বাস এমন এক জন আদর্শ মানুষের মুর্তি মনের মাঝে তৈরী করে যার সাথে বাস্তবের কোন মানুষের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এই স্বপের মানুষটিকে যে সব গুনাগুণ দিয়ে আমরা সাজাই সেগুলো দিয়েই বাস্তবের মানুষগুলোকে বিচার করতে থাকি। যারজন্য দেখা যায় আমাদের জীবনের সঠিক মানুষটির খোঁজ শেষ হয় না, কারন এমন একজন মানুষকে পাওয়া যার শতকরা ১০০ ভাগ আপনার পছন্দ হবে বা সে সব বিষয়ে আপনার সাথে ১০০ ভাগ একমত হবে এক রকম অসম্ভবই বটে। আর এই অহেতুক ভাবনার কারনে আমারা আমাদের প্রত্যাশিত জীবনের নাগাল পাই না।
সত্যিকার অর্থে আপনি যাকে খুঁজছেন সে আর কেউ নয় সে হচ্ছে আপনি নিজে। আপনিই সেই মানুষ যে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে পারবেন আর শান্তি আর স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারবেন। নিজেকে খুঁজে পেলেই আপনি সত্যিকার একটা সম্পর্কের মাঝে প্রবেশ করতে পারবেন আর সেই সম্পর্ক আপনার ও আপনার জীবনে আর আপনার কাছের মানুষদের জীবনেও অবদান রাখবে। আপনি যদি আপনার আনন্দের জন্য অন্য কারো উপর নির্ভরশীল না হন, তাহলেই আপনার জীবন পরিপূর্ণতা পেয়েছেন জানবেন।
সব ঠিক হয়ে যাবেঃ
এই অলীক বিশ্বাসটার মিল আছে আরেকটা বিশ্বাসের সাথে সেটা হলো আমরা প্রায় বলি যা হয়েছে ভালর জন্য হয়েছে। এইদুটোর মধ্যেই কিছুটা চাতুরী করে সত্যের সাথে মিথ্যার মিশেল আছে। যখন জীবনের বিভিন্ন জটিলতায় বা বিপদে পরি কিংবা সব কিছু এলোমেলো করে ফেলি তখন আমরা এসব থেকে পিছু হটতে গিয়ে নিজেদের স্বান্তনা দিতে এই অলীক বিশ্বাসের সাহায্য নেই। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা নিজেদের এই সব কথা বলে সব দায় থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি, তাই এই জটিলতার বা সমস্যার আসল কারণই আমাদের কাছে অজানা থেকে যায়। আর তাই আমরা সেই সবের কারণ খুঁজে তার সমাধানও করতে পারি না, সেইজন্য সবকিছু ঠিকও হয় না। অনেকটা সেই চোখ বুজে থাকা কাক এর মত যে চোখ বুজে ভাবে কেউ তাকে দেখবে না আর সেও দেখবে না,এভাবে অদৃশ্য থেকে সে সব ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে পারবে। অথচ আমাদের যা করা উচিত তা হল জীবনে ঘটে যাওয়া জটিল এলোমেলো বিষয়গুলোকে ঠিক করার সঠিক রাস্তা খুজে পাওয়ার চেষ্টা করা। এবং এটা করতে প্রয়োজন নিজেকে প্রশ্ন করা । প্রশ্ন গুলো হতে পারেঃ
- কিভাবে এই জটিলতা বা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে?
- কি করতে হবে বিষয়টাতে যদি স্বচ্ছতা আর স্বাচ্ছন্দ্য পেতে চাই
- জটিলতাটা কি? এটা নিয়ে কি করতে পারি?আমি কি এটা পরিবর্তন করতে পারি? এটা পরিবর্তন করতে কি করতে হবে?
- কোন বিষয়টা এই ক্ষেত্রে করা ঠিক হবে যা আমি বুঝতে পারছি না?
- কি করা সম্ভব এই ক্ষেত্রে যা এখনও আমি বিবেচনায় আনিনি?
- কি করলে আরো বেশী ভাল হবে যা এখনও আমার কল্পনার বাইরে?
এই প্রশ্ন গুলি যদি খেয়াল করা যায় দেখা যাবে এই প্রশ্ন গুলো থেকে অনেক গুলো পছন্দসই সম্ভাবনার আর সচেতনার দরজা খুলে যাবে যা দিয়ে আমরা জীবনের সমস্যা আর জটিলতা থেকে বের হয়ে আসতে পারবো। এইভাবেই আপনি বিভিন্ন কারনে জীবনে যে জটিলতা, সমস্যার মধ্যে পরেছিলেন তা ঠিক করার সুযোগ পেয়ে যাবেন। হা সত্যি সব ঠিক হয়ে যাবে তখনই যখন আপনি নিজে বুঝে ঠিক করতে পারবেন কোনটা আপানার জন্য ঠিক। মনে রাখবেন আপনি আপনার জীবনের সব কিছু তৈরী করতে পারেন যা কিছু ঘটছে তা আপনার জন্যই।
সোনার হরিণ চাইঃ
বেশীরভাগ মানুষ ভাবেন যে তাদের সুখী সুন্দর জীবন পাওয়ার মাঝে কোন এক বিশেষ বাধা রয়েছে সেই বাধাটা শুধু দূর হয়ে গেলেই তাদের সুখী হওয়াকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। হতে পারে সেটা পদন্নতি, লটারি, ওজন কমানো, কিংবা স্বপ্নের পুরুষ বা নারীকে কাছে পাওয়া কিংবা অনেক টাকার মালিক হওয়া। আর আমাদের ধারানা এই ধরনের চাওয়াপাওয়া পূরণ হলেই আমরা সুখী হবো, এই ভাবনা আমাদের সবার। কিন্তু এই ভাবনা আপনাকে শুধু ফাঁদে ফেলবে,এভাবে ভাবলে শুধু সোনার হরিণের পিছনে ছোঁটা হবে কিন্তু সুখ নামের সোনার হরিণ কোন দিনই আপনাদের নাগালে আসবে না। সুখী হতে হলে কোন শর্তের প্রয়োজন হয় না। এইটা হচ্ছে পছন্দের বিষয় এটা আমাদের গন্তব্য নয়। আপনার সুখী হবার চাবিকাঠি আপনার হাতেই আছে। আপনার নিজেকে সুখী ভাবতে হবে আর তা চাইলেই সাথে সাথেই পারবেন, হয়তো শুরুতে তা অল্প কিছু সময়ের জন্য স্থায়ী থাকবে । কিন্তু এই ভাবনাই আপনার মন থেকে অলীক বিশ্বাস সরিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে নতুন এক সম্ভাবনার দিকে যেখানে সুখী হতে আপনার কোন কিছুর জন্য নির্ভর করতে হবে না শুধু আপনার ইচ্ছাই যথেষ্ঠ।
এই অলীক বিশ্বাস গুলো থেকে মুক্ত হতে পারা খুবই কঠিন। এটা সত্য, আমাদের সবার জীবন আলাদা। মানুষ হিসাবে সবার শক্তি সামর্থ্য পছন্দ আলাদা। তাই সবাই আলাদা হবে এটাই ঠিক। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় সবার জন্য এক, তাই অলীক বিশ্বাস গুলি ঝেরে ফেলুন, বিশ্বাস রাখুন আপনি পারবেন, আপনার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার শক্তি, সত্যি যদি আপনি এগুলোকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন তার ফলাফল হবে খুব বিস্ময়কর। তাই সবার আগে নিজেকে, নিজের ভিতরে আপনার যে শক্তি লুকিয়ে আছে তাকে জানতে হবে তার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। তথ্যসূত্রঃ://www.mindbodygreen.com/articles/everything-happens-for-a-reason-and-other-false-myths-to-s https top-saying












