সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরলেই আসমিয়া মার কাছে আবদার করবে, খেলার জায়গায় নিয়ে যাও। বাসার কাছেই একটা ফাস্টফুডের দোকানে বাচ্চাদের খেলার ব্যবস্থা। আধা ঘণ্টা খেলে এক্টু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন অথবা কোন দিন বার্গার খেতে খেতে বাসায় আসবে মেয়েটা। ওর খুশির জন্যই তো সব কিছু।
কিন্তু কয়দিনই বা ভাবি এই খাবারগুলোর মধ্যে আসলে কি আছে? কিভাবে চিনি, টেস্টিং সল্ট, কেমিক্যাল এডিটিভ দিয়ে খাবারকে মজাদার করা হয় বানিজ্যিক সাফল্যের জন্য। এভাবে প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন মজাদার খাবারের মোড়কে আসলে বিষ খেয়ে যাচ্ছে এই প্রজন্ম। এই বিষ ধীরে ধীরে কাজ করে কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া কিন্তু মারাত্মক। সেই মজাদার মুখরোচক বিষ আপনার শরীরে যাচ্ছে যেই ফাস্ট ফুডের মাধ্যমে তারই আরেক নাম জাঙ্ক ফুড।
বর্তমান শহুরে আধুনিক জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যাওয়া একটি নাম ফাস্ট ফুড। খুব তাড়াতাড়ি তৈরী ও পরিবেশন করা যায় এমন কিছু খাদ্যকে এই নামে ডাকা হয়। ১৯৫১ সালে ইংরেজী মরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ফাস্ট ফুড শব্দটি প্রথম স্বীকৃতি লাভ করে। আজকালের বাচ্চাদের বেশীর ভাগই ভাত মাছ, সব্জী,ডাল,মুড়ি,চিঁড়ে এই জাতীয় ঘরোয়া খাবার খেতেই চায় না। তাদের প্রিয় খাবার বার্গার,পিৎজা,মোমো,দোসা,রোল,চাউমিন,সসেজ,নাগেট,চিপস,সমুচা বা নুডুলস সফট ড্রিংকস জাতীয় খাবার। আর এসব খাবারই হল ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুড। জাঙ্ক ফুড এই জন্যই বলা হয় কারণ এই ধরণের খাবারের পুষ্টির পরিমান থাকে খুবই সামান্য কিন্তু চিনি, লবন আর চর্বি থাকে প্রচুর পরিমাণে। শুধু ছোটরা নয় বড়রাও এখন এই ধরনের খাবারের প্রতি অনেক বেশী আকৃষ্ট। আজকাল ঘর থেকে বের হলেই আপনার ধারে কাছেই পেয়ে যাবেন কোন না কোন ফাস্ট ফুডের দোকান। আর এখনতো বাইরেও যেতে হয় না খাবার খেতে মোবাইলের একটা বোতাম টিপলেই খাবার নিয়ে পৌঁছে যাবে আপানার দরজায় খাবারের হোম ডেলিভারীর প্রতিষ্ঠান গুলো। এই খাবার গুলো যতই লোভনীয় হউক না কেন আমাদের শরীরে এর ক্ষতির প্রভাব আমাদের চিন্তায় ফেলে বইকি।
কি কি ক্ষতি হয় এসব খাবারে?
১)স্থুলতাঃ ফাস্ট ফুডে উচ্চমাত্রায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি, লবন ও অনেক বেশী কোলেস্টেরল থাকে। আর এই সব খাবারের আসক্তি আপনার ওজন অবশ্যই বাড়াবে। আর স্থুলতা ডেকে আনবে ডায়বেটিকস, হৃদরোগ, জয়েন্ট পেইনের মত মারাত্মক সব রোগ।
২) উচ্চ রক্তচাপঃ বেশীর ভাগ জাঙ্ক ফুডে লবনের পরিমাণ থাকে প্রচুর। সবসময় এইধরণের খাবার খেলে তা আপনার রক্তচাপ বৃদ্ধি করবে এবং এই উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৩) কলেস্টোরেল বৃদ্ধি করেঃ ভাজা পোঁড়া খাবারে প্রচুর পরিমাণে ট্রান্স বা খারাপ ফ্যাট থাকে। আর এই ট্রান্স ফ্যাট রক্তে এলডিএল বা খারাপ কলেস্টোরেলের পরিমণ বাড়িয়ে দেয়।
৪) ডিপ্রেশনঃ অনেক সময় ফাস্ট ফুড কিশোর কিশোরীদের ডিপ্রেশনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বয়েসে হরমোনের পরিবর্তন হয়, যা তাদের তাদের আচার আচরণে আর মেজাজের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্বাস্থ্য সম্মত খাওয়াতে যে পুষ্টি উপাদান থাকে তা এই ধরণের হরমোনের পরিবর্তনের সাথে একটা সমতা তৈরী করতে পারে। কিন্তু জাঙ্ক ফুডে এই সব পুষ্টি উপাদান না থাকায় কিশোর কিশোরীদের ডিপ্রেশনে ভোগার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৫)ডায়বেটিকসঃ অতিরিক্ত পরিমাণে জাঙ্ক ফুড গ্রহনের মাধ্যমে টাইপ-২ ডায়বেটিকস হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কোল্ড ড্রিংকস,আইসক্রীম, চকলেটের মতো খাবারে প্রচুর চিনি থাকে আবার কিছু ফাস্ট ফুডে কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করা হয়। এ সব খাবার খেলে স্বভাবিকের তুলনায় দেহে বেশী চিনি পরিমান বৃদ্ধি পায়, অগ্নাশয় হতে নিঃসৃত হয় ইনসুলিন যাতে কোষ এই অতিরিক্ত চিনি শোষণ করতে পারে। কিন্তু প্রতিনিয়ত এরকম চিনির মাত্রা উঠানামা করলে অগ্নাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং ইনসুলিনের নিঃসরণের পরিমাণও হ্রাস পায়। ফলাফল হয়ে দাড়ায় টাইপ ২ ডায়বেটিকস।
৬) হজম ক্ষ্মতা কমে যায়ঃ সব সময় যারা জাঙ্ক ফুড খায় তাদের হজম সমস্যা হবেই। অনেক জাঙ্ক ফুডই ডুবো তেলে ভাঁজা হয় তাই এসিডিটি তৈরী করে। বেশী মসলাযুক্ত এই সব খাবারের জন্য পাকস্থলীর দেয়ালে জ্বালাপোড়া হয় অনেক সময়। আর হজমের জন্য যে আশের দরকার হয় তা তো এই সব খাবারের মধ্যে খুবই কম থাকে।
৭) মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাতে প্রভাব ফেলেঃ আমরা অনেকেই জানিনা এই জাঙ্ক ফুড সব সময় খেলে তা আমাদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থের নিসঃরণ কমিয়ে দেয় যা আমাদের স্মরন শক্তিতে প্রভাব ফেলে। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে এই সব খাবারে খারাপ চর্বি আমাদের নতুন কিছু শিখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
৮) কিডনী রোগের কারণঃ খেয়াল করে দেখেছেন কখনো এক বার ফেঞ্চ ফ্রাই আর চিপস খেতে থাকলে আপনি সেগুলো খাওয়া থেকে কিছুতেই নিজেকে বিরত করতে পারেন না। এর কারণ কি জানেন? কারন হচ্ছে এই সব খাবারে যে পরিশোধিত লবন ব্যবহার করা হয় তা এমন কিছু এনজাইম নিসঃরণ করে যা আমাদের মধ্যে বার বার খাবার চাহিদা তৈরী করে। আর এই সব খাবারের খারাপ চর্বি আর লবনের সোডিয়াম আমদের ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দেয় এবং তা আমাদের কিডনীর ক্ষতি করে।
৯) ত্বকের সমস্যাঃ জাঙ্ক ফুড এ শর্করার পরিমাণ এত বেশী থাকে যা পরবর্তীতে শরীরে চিনির পরিমান বাড়িয়ে দেয় আর এই হটাৎ বেড়ে যাওয়া চিনির কারনে ব্রন খুব বেশী হয়। দেখা গেছে খুব বেশী ফাস্ট ফুড খায় যে সব কিশোর কিশোরী তাদের একজিমার মত চর্ম রোগ হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে।
১০) এ্যজমা ও অল্পতে হাঁপিয়ে যাওয়াঃ জাঙ্ক ফুডের কারণে অতিরিক্ত মোটা হয়ে গেলে দেখা যায় তা হার্ট ও ফুসফুসে চাপ সৃষ্টি করে। আর তাই দেখা যায় তখন অল্প হাটা বা সিড়ি বেয়ে উঠলে, ব্যায়াম করলেই শ্বাস প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যেসব বাচ্চারা সপ্তাহে তিনদিন ফাস্ট ফুড খায় তাদের এ্যজমা হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে।।
১১) দাঁতের ক্ষয়ঃ ফাস্ট ফুডের মধ্যে যে শর্করা আর চিনি আছে তা এক ধরণের এসিড তৈরি করে যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে। আর এনামেল ক্ষয় হয়ে গেলে দাঁতের মধ্যে গর্ত হয়ে যায় এক সময় তা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
তথ্য সূত্রঃ https://food.ndtv.com/food-drinks/what-is-junk-food-why-is-it-bad-for-you-1772375












